×

৭ বার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ! ৩১ বছর পর মুক্ত নলিনী, রাজীব-হত্যায় কী ভূমিকা ছিল তাঁর?

 
নলিনী

নয়াদিল্লি:  সুপ্রিম নির্দেশে ৩১ বছর পর জেল থেকে মুক্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত নলিনী শ্রীহরণ৷ তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ লাঘব করে শীর্ষ আদালত।

আরও পড়ুন- পাথরের খনিতে ধস, মিজোরামে একাধিকের মৃত্যুর আশঙ্কা

জেল থেকে বেরিয়ে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন রাজীব হত্যায় অপরাধী নলিনী৷ বারবারই তিনি দাবি করেছেন,  রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডে আদতে তাঁর কোনও ভূমিকাই ছিল না। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। নলিনীর কথায়, স্বামী মুরুগানের কিছু বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। সেই সূত্রেই এই পরিকল্পনায় তাঁর নাম জড়িয়ে যায়৷ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্তে প্রত্যক্ষ কোনও যোগই ছিল না তাঁর৷ 


নলিনী বলেন, ‘‘আমি জানি, আদালতে আমি দোষী সাব্যস্ত হয়েছি। কিন্তু আমার বিবেক জানে আমি নির্দোষ। আমার স্বামীর কিছু বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই আমি ফেঁসে গিয়েছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘হ্যাঁ, ওঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। দোকান-বাজার থেকে সিনেমা হল কিংবা হোটেলে আমি ওঁদের সঙ্গে যেতাম। তবে কারও সঙ্গেই বিশেষ কথাবার্তা হত না। ওঁদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগও ছিল না।’’


তবে স্বামীর বন্ধুদের নানা সময় তিনি যে সাহায্য করেছেন, সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন নলিনী৷ তিনি বলেন, ‘‘ওঁরা যা যা চেয়েছিল, আমি তাতে সাহায্য করেছিলাম মাত্র।’’ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ৭ বার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়৷ সেই আদেশপত্র হাতে পেয়েছিলেন নলিনী। ৭ বার মৃত্যুভয় গ্রাসও করেছিল তাঁকে। পরে অবশ্য মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হন তিনি৷ ২০০১ সালে নলিনীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এতে সনিয়া গান্ধীর হস্তক্ষেপও ছিল৷ 


চেন্নাইয়ের একটি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক নলিনী শ্রীহরণ। তাঁর বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মী। মা নার্স। চেন্নাইয়ের একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন নলিনীও। পরিবারের কেউই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে তাঁর ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন মুরুগান৷ তাঁর সঙ্গেও মুরুগানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়৷ সেই সূত্রেই নলিনীর নাম জড়িয়ে যায় রাজীব-হত্যার সঙ্গে৷  

১৯৯১ সালের ২১ মে, তামিলনাড়ুর শ্রীপেরমবুদুরে একটি নির্বাচনী জনসভায় গিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী৷ সেখানেই ফিদায়েঁ হামলায় মৃত্যু হয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর৷ এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন মুরুগান, নলিনী-সহ মোট ৬ জন। প্রথমে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সকলেরই সাজা মকুব করা হয়।


রাজীব গান্ধীকে হত্যা করেছিলেন লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর সদস্য ধানু নামের এক মহিলা। চেন্নাইয়ের ওই নির্বাচনী জনসভায় পুষ্পস্তবকের মধ্যে বোমা বেঁধে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রাজীব গান্ধীর সামনে৷ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তীব্র বিস্ফোরণ৷ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ধানুর দেহ। বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় প্রধানমন্ত্রীরও। এই ঘটনার দু’মাস আগে এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের নির্দেশে শ্রীলঙ্কা থেকে জলপথে মাদ্রাজ (বর্তমানে চেন্নাই) পৌঁছেছিলেন ধানু৷ 


উত্তর-পূর্ব শ্রীলঙ্কায় ক্রমশ শাখা বিস্তার করছিল তামিল জঙ্গি সংগঠন ছিল এলটিটিই। সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন নলিনীর স্বামী মুরুগান। সেই সূত্রেই রাজীব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গড়ে ওঠে নলিনীর যোগসূত্র।


ওই সভাস্থলে যাঁরা যাঁরা ছিলেন, তাঁরা বেশির ভাগই বিস্ফোরণে মারা যান। একমাত্র বেঁচে গিয়েছিলেন নলিনী। নিহত এক চিত্রগ্রাহকের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল নলিনী সহ বাকিদের ছবি৷ সেই সূত্র ধরেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে৷ 


মুরুগান এবং নলিনীর একটি কন্যাসন্তান রয়েছে৷ ১৯৯২ সালে কারাগারেই সন্তানপ্রসব করেন তিনি। সেই মেয়ের যখন ২ বছর বয়স, তখন তাঁকে মায়ের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। জেলের বাইরে বড়ে ওঠেন নলিনীর মেয়ে হরিথ্রা। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সেই মেয়ের সঙ্গেই বাকি জীবনটা কাটাতে চান নলিনী৷ হরিথ্রা বর্তমানে ব্রিটেনে থাকেন। তিনি সখানকার এক জন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। 


নলিনীর কথায়, মেয়ে হয়তো তাঁকে ভুলেই গিয়েছে। মাকে ছাড়াই বড় হয়েছে সে৷ তবে এখন তিনি প্রাপ্তবয়স্ক। তাই মেয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। তবে মেয়ে তাঁকে বুঝবেন, সেই আশাই নলিনীর।


চলতি বছর মে মাসে রাজীব হত্যায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পেরারিভালনকে মুক্তি দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। ওই একই যুক্তি দেখিয়ে মাদ্রাজ হাই কোর্টে মুক্তির আবেদন জানান নলিনী এবং রবিচন্দ্রন। গত জুন মাসে মাদ্রাজ হাই তাঁদের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানোর ‘পরামর্শ’ দেয়। এর  পরেই সুপ্রিম নির্দেশে ৩১ বছর ধরে জেলবন্দি নলিনীদের মুক্তি দেয় শীর্ষ আদালত।


এর আগে বহু বার মুক্তির আর্জি জানিয়েছে নলিনী৷ গত তিন দশকে একাধিক বার অনশন করেছেন৷ বছর দু’য়েক আগে ভেলোর সংশোধনাগারে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন৷  অবশেষে শনিবার মেলে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। এখন নতুন জীবনের স্বপ্ন দু’চোখে তামিল কন্যার চোখে৷ 
 

From around the web

Education

Headlines