আজ বিকেল: ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের পয়লা এপ্রিল একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। এই দিন থেকে ‘আয়কর আইন ২০২৫’ কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি চারটি নতুন শ্রমবিধির যুগপৎ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা মূলত ‘উন্নত ভারত’ (Viksit Bharat) গড়ার লক্ষ্যে এক শক্তিশালী পদক্ষেপ বলে মনে করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই পরিবর্তনটি শুধুমাত্র কর ব্যবস্থার সংস্কার নয়, বরং পেশাদার আধুনিকীকরণের দিকে একটি রূপান্তর বা ‘প্যারাডাইম শিফট’। সরকার যে চারটি প্রধান শ্রমবিধি প্রবর্তন করেছে সেগুলি হল- বেতন সংক্রান্ত বিধি (Code on Wages, 2019), শিল্প সম্পর্ক বিধি (Industrial Relations Code, 2020), সামাজিক সুরক্ষা বিধি (Code on Social Security, 2020) এবং পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত বিধি (Occupational Safety, Health and Working Conditions Code, 2020)। তবে এই নতুন ব্যবস্থার একটি দ্বিমুখী প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যেমন নতুন আয়কর আইন প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে করদাতাদের বিভিন্ন ছাড়ের সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমবিধিগুলির কারণে কর্মীদের হাতে পাওয়া বেতনের (take-home pay) পরিমাণ কিছুটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা এই ভারসাম্য ও বেতন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
বেতন কাঠামোর পরিবর্তন: ৫০ শতাংশ মূল বেতনের (Basic Pay) প্রভাব
বেতন কাঠামোর কৌশলগত পুনর্গঠন এখন এইচআর (HR) বিভাগগুলির জন্য একটি পরিচালনগত অপরিহার্যতা এবং কর্মীদের জন্য একটি প্রধান আর্থিক অগ্রাধিকার। নতুন শ্রমবিধির অধীনে ‘বেতন’ বা ‘Wages’-এর সংজ্ঞায় যে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা প্রতিটি চাকরিজীবীর বোঝা একান্ত প্রয়োজন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন কর্মীর মোট পারিশ্রমিকের (Cost to Company বা CTC) অন্তত ৫০ শতাংশ হতে হবে ‘মূল বেতন’ বা Basic Pay। বর্তমানে অধিকাংশ সংস্থা কর সাশ্রয় ও নগদ প্রবাহ বজায় রাখতে মূল বেতন কম রেখে ‘স্পেশাল অ্যালোয়েন্স’ বা ‘ফ্লেক্সি-বেনেফিট’-এর মতো বিবিধ ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে রাখে। কিন্তু নতুন বিধিতে এই ধরনের ‘ক্যাচ-অল’ উপাদানগুলিও এখন বেতনের অংশ হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু কোম্পানিগুলি তাদের মোট ব্যয় বা CTC অপরিবর্তিত রাখতে চাইবে, তাই মূল বেতন বাধ্যতামূলকভাবে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে গিয়ে তারা অন্যান্য ভাতার পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে।
একজন কর্মীর ওপর এর প্রভাব:
অবসরকালীন সঞ্চয় বৃদ্ধি: মূল বেতন বাড়ার ফলে গ্র্যাচুইটি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডে (PF) অবদানের পরিমাণ বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মীর অবসরকালীন তহবিলকে আরও শক্তিশালী করবে।
হাতে পাওয়া বেতন হ্রাস: মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে পিএফ এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ কর্তন বেড়ে যাওয়ায় মাসের শেষে হাতে পাওয়া টাকার পরিমাণ বা মাসিক লিকুইডিটি সংকুচিত হবে।
নিয়োগকর্তার ব্যয় বৃদ্ধি: যেহেতু পিএফের অবদান মূল বেতনের শতাংশের ওপর নির্ভরশীল, তাই মূল বেতন বাড়লে নিয়োগকর্তার প্রদেয় পিএফের অংশও বাড়বে, যা কোম্পানির মোট পরিচালনা খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) এবং টেক-হোম স্যালারি
দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক সুরক্ষা বনাম স্বল্পমেয়াদী আর্থিক সমন্বয়- নতুন শ্রমবিধিতে এই বিষয়টিই প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়ম হল, যাদের আয় ১৫,০০০ টাকার বেশি, তাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মাসিক অবদান ১,৮০০ টাকা। তবে অধিকাংশ নামী প্রতিষ্ঠান সাধারণত কর্মীর মূল বেতনের ১২ শতাংশ পিএফ হিসেবে জমা দেয়।
নতুন বিধিতে মূল বেতন যখন বাধ্যতামূলকভাবে মোট বেতনের ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে, তখন ১২ শতাংশ হারে পিএফ কাটার পরিমাণও যান্ত্রিকভাবেই বেড়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও কর্মীর মূল বেতন আগে মোট বেতনের ৩০ শতাংশ হতো এবং এখন তা ৫০ শতাংশ হয়, তবে তার পিএফ কাটার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ওই কর্মীর ‘টেক-হোম স্যালারি’ কমবে। যদি কোনও কোম্পানি ১২ শতাংশ হারে পিএফ প্রদান অব্যাহত রাখে, তবে মূল বেতন বাড়ার সাথে সাথে নিয়োগকর্তার প্রকৃত আর্থিক অবদানও বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত কর্মীর হাতে আসা বেতনের পরিমাণকে আরও কমিয়ে দেবে।
আয়কর আইন ২০২৫: প্রশাসনিক সহজীকরণ এবং নতুন নিয়মাবলী
১৯৬১ সালের পুরনো আয়কর আইনকে সরিয়ে ‘আয়কর আইন ২০২৫’ এবং এর পরিপূরক ‘আয়কর বিধি ২০২৬’ (Income Tax Rules, 2026) প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হল স্বচ্ছতা এবং করদাতার জন্য নিয়ম মেনে চলা সহজ করা। কেন্দ্রীয় প্রত্যক্ষ কর পর্ষদ (CBDT)-এর মতে, এটি একটি আধুনিক রূপান্তর যা আইনগত আয়তন বা কলেবর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
এই নতুন আইনের অধীনে বেশ কিছু ছাড়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে-
বাড়ি ভাড়া ভাতার (HRA) ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে নির্ধারিত মেট্রো শহরগুলি ছাড়াও আরও চারটি অতিরিক্ত শহরের জন্য উচ্চতর কর ছাড়ের সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
শিশুদের শিক্ষা ও হোস্টেল খরচ, খাবার কার্ড (Meal Cards), গিফট ভাউচার এবং যাতায়াত (Conveyance) ভাতার ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা ও ছাড়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এখানে ‘করনির্ধারণ বছর’ (Assessment Year) এবং ‘পূর্ববর্তী বছর’ (Previous Year)-এর পার্থক্য মুছে ফেলে একটি একক ‘ট্যাক্স ইয়ার’ (Tax Year) কাঠামো চালু করা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের বাজেট এবং পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আয়করের স্ল্যাব বা হারে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি।
নতুন আইনে একটি বিশেষ প্রো-ট্যাক্সপেয়ার নীতি যুক্ত হয়েছে, যেখানে আয়কর রিটার্ন (ITR) দাখিলের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পেনাল্টি বা জরিমানা ছাড়াই টিডিএস (TDS) রিফান্ড দাবি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
করদাতা এবং কর্মীদের জন্য করণীয়
২০২৬-২৭ অর্থবছরটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় হিসেবে বিবেচিত হবে, তাই এই সময়ে কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত ভুল এড়াতে সঠিক নির্দেশিকা মেনে চলা প্রয়োজন। আয়কর দপ্তরের ই-ফাইলিং পোর্টালটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে পুরনো ও নতুন- উভয় আইনের অধীনেই কাজ করা যায়।
রিটার্ন দাখিল: ২০২৬ সালের জুলাই মাসে যে রিটার্ন (AY 2026-27) দাখিল করা হবে, তা পুরনো ১৯৬১ সালের আইনের অধীনে নির্ধারিত ফর্ম অনুযায়ী করতে হবে।
অ্যাডভান্স ট্যাক্স: ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে যে অগ্রিম কর বা অ্যাডভান্স ট্যাক্স প্রদান করতে হবে, তা সম্পূর্ণভাবে নতুন ‘আয়কর আইন ২০২৫’ অনুযায়ী হতে হবে।
নতুন এই সংস্কারগুলি সাময়িকভাবে মাসের শেষে হাতে পাওয়া টাকার পরিমাণে কিছুটা টান দিলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল এবং সুরক্ষিত কর্মজীবন নিশ্চিত করবে। ভারত সরকারের এই পদক্ষেপটি দেশের কর প্রশাসনকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ‘উন্নত ভারত’-এর লক্ষ্য অর্জনে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীর সরকার।