যুদ্ধের কারণে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াল স্ট্রিট? দেখুন বিশ্ব বাজারের হাল!

বাজারের অস্থিরতা প্রধান সূচকগুলিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে৷

Published On:

আজ বিকেল: চতুর্থ সপ্তাহে পা রাখল ইরান ও ইউএস-ইসরায়েল (U.S.-Israeli war against Iran) যুদ্ধ৷ আর তার জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা৷   মার্কিন সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে শুরু করেছে৷ ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ৷ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিরোধের ডাক এবং মার্কিন সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও জটিল করে তুলেছে৷ এই পরিস্থিতিতে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন এই রূঢ় বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন যে, এই সংঘাত কেবল কয়েক সপ্তাহের বিষয় নয়, বরং কয়েক মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধের এই দীর্ঘস্থায়িত্ব বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত করছে৷ যা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে৷  বাজারের অস্থিরতা প্রধান সূচকগুলিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে৷

ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলিতে বড় ধরনের ধস দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে ‘ট্রিপল উইচিং’ (Triple Witching), যেখানে স্টক অপশন, ইনডেক্স অপশন এবং ফিউচার কন্ট্রাক্টের একযোগে মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়৷ ফলে মার্কিন এক্সচেঞ্জগুলিতে রেকর্ড ২৭.৫ বিলিয়ন শেয়ার লেনদেন হয়েছে৷

প্রধান সূচকসমূহের পরিসংখ্যান:

* S&P 500: ১.৫১% পতন ঘটে সূচকটি ৬,৫০৬.৪৮ পয়েন্টে নেমেছে, যা গত সেপ্টেম্বর থেকে সর্বনিম্ন।
* Nasdaq Composite: ২.০১% হ্রাস পেয়ে ২১,৬৪৭.৬১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এটি গত ২৯ অক্টোবরের রেকর্ড উচ্চতা থেকে প্রায় ১০% নিচে নেমে ‘কারেকশন টেরিটরি’ (Correction territory)-তে প্রবেশ করেছে।
* Dow Jones Industrial Average: ০.৯৬% পতনের মাধ্যমে ৪৫,৫৭৭.৪৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
* Russell 2000: ছোট কোম্পানিগুলোর এই সূচকটি ২.২৬% হ্রাস পেয়েছে, যা গত ২২ জানুয়ারির রেকর্ড উচ্চতা থেকে প্রায় ১০% নিচে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রধান তিনটি সূচকই ২০০ দিনের মুভিং অ্যাভারেজের (200-day Moving Average) নিচে অবস্থান করছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রবণতা বা ‘বেয়ারিশ সেন্টিমেন্ট’ (Bearish Sentiment)-এর স্পষ্ট সংকেত দিতে শুরু করেছে৷ সূচকগুলির এই পতন নির্দেশ করে যে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বাজারের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সেক্টর-ভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন

ক্রমবর্ধমান সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে এসএন্ডপি ৫০০-এর ১১টি সেক্টরের মধ্যে ৯টিই পতনের সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান বন্ড ইল্ডের কারণে বিনিয়োগকারীরা ডিভিডেন্ড-নির্ভর খাতগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন৷

ইউটিলিটি (Utilities) -৪.১১% সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত। রিয়েল এস্টেট (Real Estate) -৩.১৫% ঋণের খরচ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহে বড় পতন। এনার্জি (Energy) প্রায় অপরিবর্তিত টানা ১৩ সপ্তাহ বৃদ্ধি-যা ১৯৮০-এর দশকের পর দীর্ঘতম সাফল্য।

এনার্জি সেক্টরের এই অভাবনীয় চাপের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য এবং ভেনেজুয়েলার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি৷ ভেনেজুয়েলা এবং যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এনার্জি সেক্টর ১৯৮০-এর দশকের পর তাদের দীর্ঘতম জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। সেক্টর-ভিত্তিক এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে ক্রমবর্ধমান ট্রেজারি ইল্ড এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ।

 কর্পোরেট বিশ্লেষণ

বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা থেকে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ খ্যাত টেক জায়ান্টরাও রেহাই পায়নি৷ এনভিডিয়া (Nvidia) ও টেসলা (Tesla): উভয় কোম্পানিই ৩%-এর বেশি বাজার মূল্য হারিয়েছে৷  অ্যালফাবেট, মেটা এবং মাইক্রোসফট: এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার প্রায় ২% হ্রাস পেয়েছে।

বিশেষ কেস স্টাডি: সুপার মাইক্রো কম্পিউটার (Super Micro Computer) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতের জনপ্রিয় কোম্পানি সুপার মাইক্রো কম্পিউটারের শেয়ার এক দিনেই ৩৩% হ্রাস পেয়েছে। কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে চিনে অন্তত ২.৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের এআই প্রযুক্তি পাচারের অভিযোগ আসায় এই বিপর্যয় ঘটে৷ এই ঘটনাটি সমগ্র এআই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত হেনেছে৷

বাজারের এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেও কুরিয়ার জায়ান্ট ফেডেক্স (FedEx) কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে বলে কোম্পানিটি ইতিবাচক পূর্বাভাস দেওয়ায় তাদের শেয়ারের দাম প্রায় ১% বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ

বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেয়ার বাজার ঝুঁকি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে৷ ইউএস-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠায় মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে৷ সাম্প্রতিক ওয়াল স্ট্রিট আপডেট অনুযায়ী, প্রধান সূচকগুলির কারিগরি অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল এবং বাজার এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে৷

বিনিয়োগকারীদের এখন মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি৷ তেলের বাজারের অস্থিরতা বিবেচনা করে এনার্জি সেক্টরের প্রতি নজর রাখার পাশাপাশি পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্ব দিতে হবে৷ যেহেতু ফেড সুদের হার বাড়ানোর (Rate Hike) ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাই উচ্চ ঋণগ্রস্ত কোম্পানিগুলি থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে রক্ষণাত্মক খাতে (Defensive Sectors) নজর দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে৷ স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতা বাজারে ভীতির সৃষ্টি করলেও, দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগকারীদের অর্থনৈতিক ডেটা এবং বন্ড মার্কেটের গতিবিধির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন৷

Leave a Comment