আজ বিকেল: বর্তমান শেয়ার বাজার চরম অস্থিতিশীল বা ‘ভোলাটাইল’ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে৷ বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই দ্বিধায় পড়েন যে, এই বাজার পতনের সময় (Buy the dip) শেয়ার কিনবেন, নাকি মার্কেট রিভার্সালের সময় বিক্রি (Sell the reversal) করবেন৷ ‘ভোলাটাইল’ পরিস্থিতিতে বড় ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে সঠিক স্টক নির্বাচনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘টেকনিক্যাল অ্যানালিসিস চেকলিস্ট’ থাকা অত্যন্ত জরুরি৷
ফান্ডামেন্টাল অ্যানালিসিসের মতো টেকনিক্যাল অ্যানালিসিসেও বিনিয়োগকারীদের ‘টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ’ (Top-down approach) ব্যবহার করা উচিত৷ এর অর্থ হল, প্রথমে সম্পূর্ণ বাজারের ট্রেন্ড বুঝতে হবে, তারপর নির্দিষ্ট সেক্টরের অবস্থা এবং শেষে নির্দিষ্ট স্টকের বিশ্লেষণ করতে হবে৷ নিম্নে স্টক কেনার আগে ৫টি প্রধান টেকনিক্যাল চেক লিস্ট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা জরুরি৷
শেয়ার কেনার আগে ৫টি টেকনিক্যাল চেক লিস্ট-
১. বাজার এবং সেক্টরের সামগ্রিক ট্রেন্ড (Overall Market & Sector Trend): সর্বপ্রথম একটি লার্জার টাইমফ্রেমে বাজারের সামগ্রিক ট্রেন্ড দেখতে হবে৷ বাজার যদি শর্ট-টার্মে নিম্নমুখী বা ডাউনট্রেন্ডেও থাকে, তবে দেখতে হবে কোন সেক্টরগুলি নিফটির (Nifty) তুলনায় কম পড়ছে বা আউটপারফর্ম করছে৷ উদাহরণস্বরূপ, নিফটি যদি ১২.৫% পড়ে এবং একই সময়ে পিএসইউ (PSU) ব্যাংক বা ফার্মা সেক্টর তুলনামূলক অনেক কম পড়ে, তবে সেই সেক্টরের স্টকগুলিকে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে৷
২. মুভিং অ্যাভারেজ এবং মোমেন্টাম (Moving Averages and Momentum): একটি নির্দিষ্ট স্টক আপট্রেন্ডে আছে কি না তা নিশ্চিত করতে ডেইলি চার্টে স্টকটির ৫০ ডেমা (50 DMA) এবং ২০০ ডেমা (200 DMA)-এর উপরে থাকা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন অনেকে৷ এর পাশাপাশি স্টকের মোমেন্টাম বুঝতে আরএসআই (RSI) সূচকটি যাচাই করা যেতে পারে৷ RSI ৫৫ বা ৬০-এর উপরে থাকলে তা ভালো মোমেন্টাম নির্দেশ করে৷ তবে এটি ৮০-এর উপরে গেলে ‘ওভারহিটেড’ বা অতিমূল্যায়িত হতে পারে, যেখানে ট্রেন্ড রিভার্সালের ঝুঁকি থাকে৷
৩. ভলিউম কনফার্মেশন (Volume Confirmation): স্টক যখন নিম্নমুখী থাকে, তখন ট্রেডিং ভলিউম কম থাকা একটি ইতিবাচক লক্ষণ৷ কারণ এর অর্থ হল, প্রাইস কমলেও বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (Institutions) স্টকটি বিক্রি করছেন না। কিন্তু যখন স্টকে ব্রেকআউট হয়, তখন ভলিউম ৩০ দিনের গড়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়া উচিত, যা স্টকের প্রতি কনভিকশন বা দৃঢ়তা প্রমাণ করে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ৷
৪. ভোলাটিলিটি কম্প্রেশন বা মূল্য সংকোচন (Volatility Contraction/Compression): শেয়ার বাজারে বড় মুভমেন্ট সাধারণত ‘কম্প্রেশন’ বা সংকোচন থেকে শুরু হয়৷ স্টকটি যখন একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে সংকুচিত হতে থাকে এবং ভোলাটিলিটি কমতে থাকে (যেমন ২০% থেকে কমে ৫% বা ৩%), তখন বুঝতে হবে এটি যেকোনও একদিকে বড় ব্রেকআউটের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে৷ মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের৷
৫. রিলেটিভ স্ট্রেংথ (RS Rating) যাচাই: স্টকটি সামগ্রিক বাজারের তুলনায় কতটা শক্তিশালী তা পরিমাপ করতে রিলেটিভ স্ট্রেংথ বা RS রেটিং দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ৷
রিলেটিভ স্ট্রেংথ বা RS রেটিং কীভাবে স্টকের শক্তি পরিমাপ করে?
ম্যানুয়ালি এক্সেল শিটে হিসেব করার বদলে ট্রেডিংভিউ (TradingView)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে ‘RS Rating’ ইন্ডিকেটর ব্যবহার করে খুব সহজেই স্টকের আপেক্ষিক শক্তি বোঝা যায়৷ আরএস রেটিং (RS Rating) মূলত নির্দেশ করে স্টকটি সামগ্রিক বাজারের অন্যান্য স্টকের তুলনায় কেমন পারফর্ম করছে৷ উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও স্টকের RS রেটিং ৮৬ হয়, তার অর্থ এই নয় যে এটি ৫০০টির মধ্যে ৮৬ তম স্থানে আছে; বরং এর অর্থ হল, এটি শীর্ষ ১৪% স্টকের মধ্যে অবস্থান করছে বা ১০০-এর মধ্যে ৮৬ নম্বর পেয়েছে৷ বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০-এর উপরে যেকোনও RS রেটিংকে যথেষ্ট ভালো বলে মনে করা হয়৷
বোলিঞ্জার ব্যান্ড স্কুইজ এবং ভলিউম ব্রেকআউট কেন গুরুত্বপূর্ণ? (Bollinger Band Squeeze)
বোলিঞ্জার ব্যান্ড স্কুইজ (Bollinger Band Squeeze): সব সময় চার্টে প্রাইস কম্প্রেশন খালি চোখে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না, সেক্ষেত্রে ‘বোলিঞ্জার ব্যান্ড স্কুইজ’ একটি চমৎকার হাতিয়ার৷ যখন ব্যান্ডের পরিধি একেবারে সংকুচিত হয়ে আসে (যা এক বা একাধিক মাস ধরে চলতে পারে), তখন তা নির্দেশ করে যে ভোলাটিলিটি তলানিতে ঠেকেছে৷ এই স্কুইজ বা সংকোচনের পর যখন ব্রেকআউট ঘটে, তখন স্টকটি খুব দ্রুত এবং শক্তিশালী মুভমেন্ট দিতে পারে৷
ভলিউম ব্রেকআউট (Volume Breakout): বোলিঞ্জার ব্যান্ড স্কুইজ বা কনসোলিডেশন ফেজের পর স্টকটি ব্রেকআউট করলে, তার সাথে ভলিউম স্পাইক (Volume Spike) বা ভলিউমের আকস্মিক বৃদ্ধি হওয়া অত্যাবশ্যক৷ ব্রেকআউটের সময় উচ্চ ভলিউম নিশ্চিত করে যে, প্রচুর নতুন ক্রেতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই স্টকে অংশ নিতে প্রবলভাবে আগ্রহী৷ এটি ব্রেকআউটটিকে ‘ফলস ব্রেকআউট’ বা ভুয়ো সংকেতের হাত থেকে রক্ষা করে৷ বিনিয়োগকারীদের ট্রেডিং কনভিকশন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে৷
(সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সর্বদা বাজারগত ঝুঁকির সাপেক্ষ। সোশ্যাল মিডিয়ার কোনও ভুয়ো স্টক টিপস বা অবিশ্বাস্য রিটার্নের প্রলোভনে পা দেবেন না।)