আজ বিকেল: ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বর্তমানে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। টিসিএস বা ইনফোসিসের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে কোফোর্জের (Coforge) মতো মাঝারি মানের কোম্পানিগুলি এখন বেশ আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন এআই (AI) সলিউশন প্রোভাইডার ‘এনকোরা’ (Encora)-কে ২.৩৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেওয়ার এই মেগা ডিলটি আইটি বাজারের সমীকরণ বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি কেবল একটি সাধারণ অধিগ্রহণ নয়, বরং প্রযুক্তি বাজারে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
২.৩৫ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হল, ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যে কোফোর্জের বার্ষিক আয় ২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে নিয়ে যাওয়া। এই বিশাল অংকের বিনিয়োগের মাধ্যমে কোফোর্জ মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড এবং ডাটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো উচ্চ-বৃদ্ধি সম্পন্ন খাতে নিজেদের ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিচ্ছে। তবে এই মাপের একটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানিকে বেশ কিছু জটিল আইনি ও আর্থিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে। যা একজন সচেতন বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের বোঝা প্রয়োজন।
ওভারসিজ ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (ODI) এবং আরবিআই-এর ভূমিকা
যখন কোনও ভারতীয় কোম্পানি দেশের বাইরে অন্য কোনও ব্যবসায় সরাসরি বড় অংকের বিনিয়োগ করে, তখন তাকে ফিন্যান্সের ভাষায় ওভারসিজ ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (ODI) বলা হয়। কোফোর্জের ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরবিআই (RBI)-এর বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল।
সাধারণত ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশে পাঠাতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত কড়া নজরদারি চালায়। এর মূল কারণ হল, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা করা এবং বড় অংকের পুঁজি বাইরে চলে যাওয়ার ফলে যেন অভ্যন্তরীণ ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা’ (financial stability) বিঘ্নিত না হয় তা নিশ্চিত করা। এই চুক্তিটি সফল করতে কোফোর্জকে মূলত তিনটি প্রধান অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবুজ সংকেত পেতে হয়েছে:
ক) ১ বিলিয়ন ডলারের অধিক ওডিআই (ODI) অনুমোদন।
খ) যেহেতু এনকোরা একটি ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, ফলে, এই অঞ্চলের বাজারে ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়েছে।
অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে?
এই আইনি ধাপগুলি পার হওয়ার পর বড় প্রশ্নটি ছিল, এত বিশাল অংকের অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে?
২.৩৫ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তিতে কোফোর্জ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শেয়ার এবং ঋণের একটি মিশ্রণ ব্যবহার করেছে। এর ফলে কোম্পানির ওপর নগদ অর্থের চাপ কিছুটা কম থাকবে।
ইক্যুইটি অংশ ১.৮৯ বিলিয়ন ডলার (১৮১৫.৯১ টাকা দরে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে)
ঋণ বা ডেট ৫৫০ মিলিয়ন ডলার (ব্রিজ লোন বা প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে)
এখানে একটি বিশেষ আর্থিক কৌশল লক্ষ্যণীয়। কোফোর্জ এনকোরার বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিত কোম্পানির ২০% মালিকানা দিচ্ছে। এতে দুটি লাভ: প্রথমত, কোফোর্জকে পুরো টাকা নগদে দিতে হচ্ছে না (Capital Conservation), এবং দ্বিতীয়ত, এনকোরার পুরনো মালিকদের স্বার্থ এখন কোফোর্জের সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেল (Alignment of Interests)। এছাড়া এনকোরার আগের যে ঋণগুলি ছিল, সেগুলি পরিশোধ করতে কোম্পানি ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি ব্রিজ লোন (Bridge Loan) বা স্বল্পমেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করেছে।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য আসল প্রশ্ন হল, এই বিশাল খরচ কি শেষ পর্যন্ত কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে পারবে? শেয়ার বাজারে একটি বহুল ব্যবহৃত টার্ম হলো ‘EPS Accretive’। সহজ ভাষায়, যখন কোনও নতুন কোম্পানি কেনার ফলে মূল কোম্পানির ‘শেয়ার প্রতি আয়’ (Earnings Per Share) আগের চেয়ে বেড়ে যায়, তখন তাকে ইপিএস অ্যাক্রিশন বলা হয়। (নতুন অর্জিত মুনাফা – অর্থায়নের খরচ বা সুদ) / মোট শেয়ার সংখ্যা)
যদি এই হিসাবটি আগের EPS-এর চেয়ে বেশি হয়, তবে ডিলটি বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভজনক। কোফোর্জ আশা করছে, ১৪% অপারেটিং মার্জিন (EBIT) বজায় রেখে ২০২৭ অর্থবছর নাগাদ এই ডিলটি ইপিএস অ্যাক্রিটিভ হবে। অর্থাৎ, এনকোরা থেকে আসা বাড়তি আয় তাদের ঋণের সুদ এবং নতুন শেয়ার ইস্যুর খরচ ছাপিয়ে যাবে।
সম্ভাবনা: বিশ্লেষকদর একাংশ বলছেন, ২০২৫ অর্থবছরে কোফোর্জের রাজস্ব ছিল ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং এনকোরার আয় ৫১৬ মিলিয়ন ডলার। এই দুটি যোগ করলে এখনই দাঁড়ায় ১.৮৫৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে ২০২৭ সালের মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোফোর্জের জন্য এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র৷ সামান্য কিছু অর্গানিক গ্রোথ থাকলেই এই লক্ষ্যমাত্রা সহজে ছোঁয়া সম্ভব৷