আজ বিকেল: মার্চ ২০২৬৷ সালটি ধাতুর বাজারের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে৷ কারণ, এই মাসে সোনা ও রূপার দামে প্রায় ১৫ শতাংশ নাটকীয় পতন দেখা গিয়েছে৷ যা ২০০৮ সালের অক্টোবরের পর অর্থাৎ গত ১৭ বছরের মধ্যে এই খাতের জন্য সবচেয়ে খারাপ মাস (Worst Month) হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে৷ তবে সাম্প্রতিক লেনদেনে ১ শতাংশ পুনরুদ্ধার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে৷ বিশ্ব বাজার অস্থির৷ (Market Volatility) তা সত্ত্বেও এই সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে কেবল একটি সংশোধন হিসেবে দেখলে ভুল হবে৷ বরং এটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির এক গভীর কৌশলগত সংকেত৷ বর্তমানে ‘Gold price today’ বা আজকের সোনার দামের এই স্থিতিশীলতা নির্দেশ করছে যে, বাজারের অংশগ্রহণকারীরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মাঝেও একটি রক্ষণাত্মক কৌশল (Defensive Strategy) অবলম্বনের চেষ্টা করছেন৷
বর্তমান দর ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা সোনার দাম বর্তমানে ০.৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৪,৫৪৪ ডলারে অবস্থান করছে (প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত)৷ যদিও মাসিক হিসেবে এটি ১৫% পতনের সম্মুখীন হয়েছে৷ তবে কৌশলগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি ত্রৈমাসিকে (Quarter) সোনার দাম এখনও ৫% উপরের দিকেই রয়েছে৷ রূপার বাজারেও ১.২% উত্থান লক্ষ্য করা গিয়েছে৷ যা এর দামকে ৭০.৮১ ডলারে নিয়ে এসেছে৷
নিচে বর্তমান বাজার দর
ধাতু বর্তমান বাজার মূল্য (প্রতি আউন্স) শতাংশ পরিবর্তন (দৈনিক)
সোনা (Spot Gold) $৪,৫৪৪ +০.৮%
রূপা (Spot Silver) $৭০.৮১ +১.২%
প্লাটিনাম $১,৯০২ +০.১%
প্যালাডিয়াম $১,৪২১ +১.১%
গত ১৭ বছরের মধ্যে মার্চের এই পতনকে ‘worst month’ হিসেবে দেখা হলেও ত্রৈমাসিক ৫% বৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদী বুলিশ ট্রেন্ড এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়ে যায়নি৷ খেলা এখনও অনেক বাকি৷ সোনার দামের এই খেলার মূলে রয়েছে মার্কিন ডলারের অবস্থান এবং বন্ড ইল্ডের নিম্নমুখী প্রবণতা৷
মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এবং বন্ড ইল্ডের প্রভাব
সোনা ও রূপার দাম পুনরুদ্ধারের পিছনে অন্যতম কারণ হল, মার্কিন ডলার ইনডেক্সের সামান্য পতন এবং ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ড ইল্ডের ৪.৩৪৪%-এ নেমে আসা৷ সাধারণত বন্ড ইল্ডের হ্রাস সোনা ও রূপার মতো সুদবিহীন সম্পদের আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের অবস্থান৷ ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সোমবার স্পষ্ট করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় নিতে পারে৷ পাওয়েলের মতে, তেল বা জ্বালানি খাতের সাময়িক ‘শক’ বা অস্থিরতাকে ফেড সাধারণত স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই দেখছে৷ তাতে সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে কোনও তাড়াহুড়ো করছে না ফেড৷ যুদ্ধের আগে বাজারে যেখানে দুটি রেট কাটের সম্ভাবনা ছিল, বর্তমানে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে৷ এই ‘Higher-for-longer’ সুদের হারের বাস্তবতাই মূল্যবান ধাতুর বড় ধরণের উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বাজারের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। তেলের বাজার এই সংকটে প্রচণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, অপরিশোধিত তেলের (Brent Crude) দাম সামান্য কমে বর্তমানে ১১১ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এই হ্রাসের মূলে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ কূটনৈতিক চাল। সেই প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে ‘আজ বিকেল’-এ৷
মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা প্রবল থাকায় বিনিয়োগকারীরা ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার ওপর আস্থা রাখছেন। ‘Iran war impact on market’ বা বাজারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে, যা সোনাকে আগামীতে আরও শক্তিশালী করতে পারে৷
এই জটিল পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা ঠিক কী পরামর্শ দিচ্ছেন? (Analysts’ Perspectives)
যতীন ত্রিবেদীর মতে, অর্থনীতির মূল সূচক বা ‘Macro Triggers’ এখনও উচ্চ সুদের হারের অনুকূলে রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত সোনার দামের বড় কোনও উত্থান আশা করা কঠিন৷ মানব মোদী উল্লেখ করেছেন যে, দাম কমে যাওয়ার ফলে বাজারে ‘Bargain Hunting’ বা সস্তায় সম্পদ কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া একটি ইতিবাচক দিক হল, নিম্নমুখী দামের কারণে ভারতে সোনার কেনার চাহিদা (Physical Demand) কিছুটা বেড়েছে৷
বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা
মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বাজার অত্যন্ত ‘ভোলাটাইল’ থাকতে পারে। বড় বিনিয়োগের আগে মার্কিন সিপিআই (CPI) এবং জবস ডেটার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা বাঞ্ছনীয়৷ এই বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে আগামী দিনের বিনিয়োগের রূপরেখা কেমন হতে পারে তার ইঙ্গিত মিলতে পারে৷
কৌশলগত পূর্বাভাস
সার্বিকভাবে সোনা ও রূপার বাজারে ১% পুনরুদ্ধার মূলত একটি সাময়িক স্বস্তি হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী মন্দার অবসান নয়৷ ভারতের এমসিএক্স (MCX) বাজারে মহাবীর জয়ন্তীর কারণে ট্রেডিং সেশনে কিছুটা পরিবর্তন এলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব সেখানেও স্পষ্ট হবে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সুদের হার সংক্রান্ত অনড় অবস্থান আগামী দিনগুলিতে সোনার গতিপথ নির্ধারণ করবে৷
বিনিয়োগকারীদের জন্য করণীয়
‘Gold price today’ নিয়ে প্রতিদিনের খবরের চেয়ে মার্কিন কর্মসংস্থান রিপোর্ট এবং কনজিউমার কনফিডেন্স ডেটার ওপর বেশি গুরুত্ব দিন৷ ‘Iran war impact on market’ মাথায় রেখে পোর্টফোলিওতে সোনার অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করুন৷ ‘Bargain Hunting’-এর সুযোগ নিন৷ প্রচলিত ‘Commodity investment tips’ মেনে চলে অস্থির বাজারে হুট করে বড় বিনিয়োগ না করে বাজার স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষা করাই হবে একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীর কাজ।
আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারের এই জটিল সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।