×

পুজো-পাঠ ২০২০: ‘দিদারগঞ্জের সেই যক্ষী’ কলমে সুমিত্র

 
সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

এই হাসির সঙ্গে কার যেন একটা মিল আছে। কিছুতেই মনে পড়ছে না উদ্ভাসের। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবতে থাকে নানা কথা। মনে হতে থাকে কেমন ছিল সেই সময়টা? যদি একবার কোনও যন্ত্র সেই সময়টা ফিরিয়ে দেখাতে পারত। কিন্তু সে আর কী করে সম্ভব!

রাতের খাবার খেয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। আলো নিভিয়ে দিয়ে চোখ বুজতেই আবার দেখতে পায় সেই হাসি। ঠিক তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল এমন নয়, তবুও এই হাসি কোথায় যেন দেখেছে। খুব চেনা।

রাজেন্দ্রনগর জায়গাটা এখন জমজমাট হয়ে যাওয়ার পরে পাটনা থেকে বেশ কিছুটা দূরে ফাতুহায় স্যাটেলাইট সিটি গড়ছে বিহার সরকার। গঙ্গার ধারে। সেই ফাতুহাতে দিদারগঞ্জ নামে একটা জায়গা আছে। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে কেমন ছিল জায়গাটা? মনে মনে নানা ছবি আঁকতে থাকে।

দিদারগঞ্জ। সমৃদ্ধ এক জায়গা। কসবা বলা যায় কিনা কে জানে। গঙ্গার তীরে স্থানীয় একজনের লাঠিতে শক্ত কিছু একটা ঠেকেছিল। উৎখনন বলতে যে বিশাল কর্মযজ্ঞের কথা বোঝানো হয় তেমন কিছু করতে হয়নি। মাটির নীচে চার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা যক্ষী সেদিন জেগে উঠেছিলেন। কার সম্পত্তি তিনি পাহারা দিচ্ছিলেন? কে তাঁকে যখ করে রেখেছিলেন? সে সব কথা জানার আর কী কোনও উপায় আছে? নাহ! দিদারগঞ্জে একাই মাটির নীচে ছিলেন তিনি। কেন ছিলেন, কবে থেকে ছিলেন সে কথা জানার উপায় নেই। ইএইচএস ওয়ালশের চিঠিতে এত কথা লেখা নেই। পাটনার তৎকালীন কমিশনার ওয়ালেশ শুধু লিথেছেন, গুলাম রসুল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দার থেকে জানা যায় মাটির নীচে শক্ত একটা বেদী আছে। ১৯১৭ সালের ১৮ অক্টোবর সেটা বের করে আনা হয়। অনেক দেখে পণ্ডিতরা মেনে নেন এটি মৌর্য যুগেই তৈরি।

মৌর্য যুগের যে সব মূর্তি পাওয়া গেছে সেগুলো সবই এমন চকচকে যেন মাছি বসলে পিছলে যাবে। তবে ১৬০ সেন্টিমিটার মাপের নারীমূর্তি! এমনটা আর পাওয়া যায় না। প্রমাণ মাপের পূর্ণ অবয়ব নারীমূর্তির বিচারে ইনিই প্রাচীনতমা। একাধারে সেবা, সৌন্দর্য ও মাতৃত্বের প্রতিমূর্তি।

পাটনা জাদুঘরে ঢোকার সময় পুরাতত্ত্বের এক ছাত্রের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল উদ্ভাসের। খানিকটা যেচেই আলাপ করেছিল। নামটা... নামটা বলেছিলেন, তবে এখন মনে করতে পারছে না। তিনিই চিনিয়ে দিয়েছিলেন মূর্তিটা। পাল-সেন যুগের মূর্তির মধ্যে যে অসংখ্য কারুকাজ সে দেখেছে, এই মূর্তিতে সেসব নেই। তবে এই মূর্তির একটা অন্য ভাব আছে। সেটা সে মূর্তি দেখেই বুঝেছিল। ডান হাতে ধরে থাকা চামরটা কাঁধের উপরে ফেলা, যেন তিনি সেবা করার জন্য প্রস্তুত। কপালে টিকলি, কানে দুল, গলায় মুক্তোর মালা, কোমরে মেখলা, হাতে বালা আর পায়ে... না একে মোটেই নূপুর বলা যায় না, ঘুঙুরও নয়। পশ্চিম ভারতের আদিবাসীদের পায়ে যেমন অলঙ্কার থাকে অনেকটা তেমন। নাকেও কি কিছু ছিল? নথ, নোলক আর নাকছাবির মধ্যে কোনও একটা? না, সেটা জানার উপায় নেই। যক্ষীর নাক আর বাঁহাত নেই। মূর্তিটা এমন ভাবেই পাওয়া গেছে।

ওই ছাত্রের সঙ্গে আলাপ করে ভালই হয়েছিল উদ্ভাসের। নারীমূর্তির নাভির নীচে দুটো দাগ দেখিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, সন্তান প্রসবের পরে এমন দাগ হয়। আর দেখিয়ে দিয়েছিল ওই যক্ষীর স্তনযুগলডানদিকেরটা সামান্য বড় বাঁদিকের তুলনায়। বাঁদিকে মন থাকে, তাই স্তন্যপান করানো মায়ের ডান দিকের স্তন নাকি সামান্য বড় হয়ে যায়। একথা উদ্ভাসের জানা ছিল না। মনটা শ্রদ্ধার ভরে ওঠে যিনি এমন মূর্তি বানিয়েছিলেন তাঁর প্রতি। কী নিখুঁত তাঁর দৃষ্টি, কী অপূর্ব তাঁর দর্শন।

সে যুগে কি মন্দির ছিলমানে মৌর্য যুগে? কে জানে। তখন তো যাগযজ্ঞই হত। মন্দির থাকলে হয়তো অমরাবতী বা ভারহুতের মতো এই যক্ষীকেও সেঁটে দেওয়া হত দেওয়ালে। তাতে মূর্তির পিছনের দিকটা আর তৈরি করার দরকার হত না। তখন নিশ্চয়ই মন্দির ছিল না। আচ্ছা, তাহলে এই মূর্তি আসলে রাখা ছিল কোথায়? রাজবাড়ির প্রধান ফটকে? এখানে কে রাজা ছিলেন?

দিদারগঞ্জে রামেরা চার ভাই এসেছিলেন বলে রামায়ণে বলা আছে। না, ঠিক দিদারগঞ্জ বলে উল্লেখ নেই, জায়গাটা ফাতুহার মধ্যেই যখন, তখন হতেই পারে এই দিদারগঞ্জেই এসেছিলেন তাঁরা। এখানেই আযোধ্যার চার ভাই মানে তাঁদের চার হবু জামাইকে আপ্যায়ন করেছিলেন জনকরাজা ও তাঁর ভাই। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠতে থাকে রামায়ণের কাল্পনিক দৃশ্যপট। ভীম আর অর্জুনকে নিয়ে সেখানে হাজির হন স্বয়ং বাসুদেব কৃষ্ণ। তাঁরা যাচ্ছেন জরাসন্ধকে বধ করতে। এখান থেকে সেই জায়গাটাও খুব একটা দূরে নয়। সেই জায়গাটাও সম্প্রতি দেখেছে উদ্ভাস, গৃধ্নকূট থেকে ফেরার সময়। সে দেখতে পাচ্ছে জরাসন্ধের সঙ্গে ভীমের সেই যুদ্ধ, মগধের রাজা জরাসন্ধের শরীরটা চিরে ফেলছেন ভীম। তবুও তার মধ্যে কোনও নৃশংসতা নেই। এখানেই বোধ হয় মহাকাব্যের সার্থকতা।

ঘুম ভেঙে যায় উদ্ভাসের। এতকিছুর মধ্যেও হাসিটা সে ভুলতে পারছে না।

পরের দিন আবার যায় পাটনা মিউজিয়ামে। মূল ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা আছে সেই যক্ষীমূর্তি যা দিদারগঞ্জ যক্ষী নামে পরিচিত। এই মূর্তিটার কথা সে শুনেছে অনেক বার। অনেকের কাছে। এটা দেখতেই সে পাটনায় এসেছে, ইতিহাসের পাটলিপুত্রে। যক্ষীর মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখতে থাকে তাঁর মুখমণ্ডল। চোখ, ভেঙে যাওয়া নাক, টিকলি। মনে হতে থাকে, ল্যুভর মিউজিয়ামে অনেকে তো যান শুধুমাত্র মোনালিসা দেখতে। এখানে কেন তেমন ভাবে লোকে আসেন না? একটা তাজমহল দেখতে লোকে যদি আগ্রায় যেতে পারে তাহলে কেন দিদারগঞ্জ যক্ষী দেখতে পাটনায় আসবে না?

এতক্ষণে অস্বস্তি কাটে। ঠিকই তো। এই হাসির সঙ্গে মিল রয়েছে মোনালিসার হাসির। মনের মধ্যে যখন তোলপাড় হচ্ছিল তখন সেই হাসিটার মধ্যে কেমন যেন একটা উদ্বেগ, দুঃখ মিশে ছিল। নিজের মনটা প্রশান্তিতে ভরে যেতে সে দেখল হাসিটা মোটেই দুঃখের নয়, আনন্দের।

সবকিছু সরল করে ফেলা যায় না। তবু তার মনে হয়, মোনালিসা ইউরোপের বলেই অত কদর। দিদারগঞ্জের যক্ষী সুদূর স্মিথসোনিয়ানে গেলেও এদেশে তার কদর কোথায়! কজন দেখেছে সেই মায়াময় হাসি? সে দেখেছে, উপভোগ করেছে। এখানেই তার প্রশান্তি।

From around the web

Education

Headlines