×

পুজো-পাঠ ২০২০: ‘কি গো কিছু হলো?’ কলমে রুমা বন্দ্যোপাধ্যায়

 
 

রুমা বন্দ্যোপাধ্যায়

"কি গো কিছু হলো? "

হাতের প্লাস্টিকের প্যাকেটটা দুয়ারের পেরেকে ঝুলিয়ে, মিঠুর দিকে একপলক তাকিয়ে কোন উত্তর না দিয়ে কলতলায় হাতপা ধুতে এগিয়ে গেলো অজিত।

মিঠু আস্তে আস্তে সরে এসে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলো।কড়াইয়ের ঢাকনাটা তুলে তরকারিটা খুন্তি দিয়ে নাড়তে নাড়তে পিছন ফিরে উঠোনের দিকে দেখলো।ছেলে দুটো খেলছে।মিনতি চানে ঢুকেছে।

কেন যে সেদিন মিনতিটাকে থেকে যেতে বলতে গেলো।ও তো চলেই যাচ্ছিল।

     বিট্টুর জন্মদিন ছিল।তাই নিজেই বলেছিল আসতে মিনতিকে।বলেছিল

"অনেকদিন তো আসিসনি।আয় না একবার।বিট্টুটাও  আনন্দ পাবে।"

মিনতি এসেছিল ছেলেকে নিয়ে একাই।শুভেন্দু আসেনি।জন্মদিন মানে বড়কিছু তো নয়।তবু অজিত  কোলকাতা থেকে কেক কিনে এনেছিল।বেলুন দিয়ে ঘরটা সাজিয়ে,মোমবাতি জ্বালিয়ে একটু হৈচৈ। দুপুরে মাংস ভাত, পায়েস।মিনতি ওর ফোনে ছবি তুলে নেটে ছেড়েছিল।অজিতও খুব খুশি ছিল।পরদিন মিনতি চলে যেতে চাইলেও মিঠু কিছুতেই ছাড়েনি।বলেছিল "আজকের দিনটা রয়ে যা,কাল খেয়েদেয়ে যাবি।"

অজিতও সায় দিয়েছিল।কে জানতো সেদিনই লকডাইন হয়ে যাবে।পরদিন সকাল থেকেই বাস ট্রেন সব বন্ধ।অজিত বড়বাজারের একটা গদিতে কাজ করে।ট্রেন বন্ধ তাই কাজে যাওয়া বন্ধ।মিনতিও আটকে গেলো।

অজিত বলেছিল, "কি আর করবে গরিব জামাইবাবুর ঘরে নয় দুটো ডালভাত খেয়েই থাকবে।"

কিন্তু দুদিন পরেই বুঝেছিল,ডালভাত খেয়ে থাকবে,মুখে বলা যতটা সহজ কাজে অতটা নয়।কাজে যেতে পারছে না বলে হাতে টাকা পয়সা কিছুই নেই।মালিককে ফোন করেছিল, মালিক স্পষ্ট বলে দিয়েছে কাজে না এলে কিছু দিতে পারবে না।এরকম  চললে এরপরে লোকের কাছে হাত পাততে হবে।মিনতির ছেলেটাও ছোট। তার দুধ বিস্কুটের জোগান আছে।সঙ্গে বিট্টু তো আছেই।এদিকে দেখতে দেখতে দশদিন হয়ে গেলো।এখনো কতদিন বাকি।মিনতিও সবই বুঝতে পারছে আর তাই অপরাধীর মত মুখ কালো করে ঘুরে বেরাচ্ছে।আনন্দের পরিবেশটা হঠাৎ করেই কেমন থমথমে হয়ে গেছে।বেচারি মিঠুও কি করবে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।

    বন্ধুর পরামর্শে অজিত আজ প্রধানের কাছে গিয়েছিল যদি অনুমতি পাওয়া যায় তবে নয় টোটো ভাড়া করেই মিনতিকে পৌঁছে দিয়ে আসতো। কিন্তু গিয়ে শুনলো প্রধান নয়, বিডিওর অনুমতি লাগবে,তাও গিয়েছিল একঘন্টা পথ পায়ে হেঁটে। যদি কাজ হয়।

অজিত এসে রান্নাঘরের দুয়ারে বসলো। অন্যসময় হলে মিঠু জামাকাপড় ছাড়ার জন্য তাড়া দিতো কিন্তু এখন কলঘর জোড়া। তাছাড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে মানুষটার মনমেজাজ ঠিক নেই।যত দিন যাচ্ছে লোকটা কেমন হয়ে যাচ্ছে।

"চা খাবে? করবো? "

অজিত মুখ ফিরিয়ে তাকালো মিঠুর দিকে, কিছুক্ষণ চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে বলল

"নাঃ আবার দুধ কম পরে যাবে।"

মিঠু কিছু বলতে যাচ্ছিল,তার আগেই মিনতি কলঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো।জামাকাপড় ভর্তি বালতিটা উঠোনে রেখে অজিতের দিকে তাকিয়ে বলল

"কি হলো জামাইবাবু? আজ কালের মধ্যে যাবার একটা ব্যবস্থা হবে তো।"

অজিত একবার মিঠুর দিকে দেখে মিনতির দিকে  তাকালো।

বিট্টু ছুট্টে এসে মাসির কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,

"ও বাবা মাসি থাকবে তো? "

তারপর বাবার উত্তরের অপেক্ষা না করেই

 বিট্টু আর পাপাই চেঁচিয়ে উঠলো

"হেএএএ,আমরা থাকবো,"

"মাসি থাকবে, থাকবে থাকবে..."

 দুজনের সমবেত  উল্লাসের মধ্যে অজিত,মিঠু আর মিনতি  পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

From around the web

Education

Headlines