×

পুজো-পাঠ ২০২০: ‘একটি ভ্রমণকাহিনি’ কলমে বিপ্লব চৌধুরী

 
 

বিপ্লব চৌধুরী

মন চেয়েছে, আমি পাহাড়ে যাব। রাতের বাসে চেপে বসলাম। গন্তব্য পাহাড়তলি। শিলিগুড়ি। এদিকে বাস তো ছাড়েই না। শুধু মালের পর মাল বোঝাই হয়েই চলে। তারপর, অবশেষে। ভোর ভোর টার্মিনাল। তেনজিং নোরগে। কালিম্পঙের বাস সাড়ে পাঁচটায়। টিকিট কেটে, চা সিগারেট এবং অপেক্ষার মাঝে হঠাৎ পড়ল মনে, পৃথিবীর প্রথম এভারেস্ট জয়ী সেই মানুষটিকে আমি দেখেছিলাম। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। বিস্ময়, ফেটে পড়েছিল। বিধান মার্কেটের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম বাবার সঙ্গে। শীতের সকালে। গায়ে দিদার বোনা নীল সোয়েটার। বাবা বলল, ওই দ্যাখ, তেনজিং নোরগে। ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন। জানলা দিয়ে, উঠোনে দাঁড়িয়ে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি হিমালয়। নীল ডানা মেলে আছে আকাশের বুকে। রাতে কার্শিয়াংদার্জিলিঙের আলো মিশে যায় তারামণ্ডলীর সাথে। চোখ, অবাক হয়ে যায়। দেখি, বিবর্ণ লেদার জ্যাকেট গায়ে, ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন লোক। বাবার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে যাই। দেখি, সত্যিই তেনজিং। বইয়ের পৃষ্ঠার ছবি আর চলন্ত একটা মুখ আর চলন্ত একটা মুখ মিলেমিশে যায় শীতার্ত শহরের পথে। তাঁকে দেখি, ধীর পায়ে  হেটে, চলে যেতে হিলকার্ট  রোডের দিকে। ওই পথ এঁকে-বেঁকে উঠে গেছে পাহাড়ের দিকে। 

 

বাস ছাড়ল, সিট জানলার ধারে। অসংখ্য বাঁধ-প্রকল্পের ফলে স্রোতহীন তিস্তা নদীটাকে দেখে আজকাল মায়া হয়। হায় রে মানুষ, নদী বন পাহাড় পর্বত চিকেন মাটন কিছুই খেতে আর বাকি রাখছে না। ভেবে শিউরে উঠি যে, একদিন সব মানুষই হয়ে হয়ে উঠবে নরখাদক। কেন না, তখন খাবার মতো অন্য কিছুই পাবে না। সব সাবাড় হয়ে যাবে। প্রকৃতি বা পাথর কিছুই থাকবে না। গাছেদের জঙ্গলে জমে আছে অনেক প্লাস্টিক। তবু এখনও ফোটে ফুল। লাল নীল হলুদের সম্ভার ভালো করে দেয় মন। ইসকুলের পথে যাচ্ছে শিশুদের সারি। একটার নাকে পোঁটা, সুড়ুত সুড়ুত করে খেয়ে নিচ্ছে। একজন কাঁদতে কাঁদতে, মা তার শক্ত করে ধরে আছে হাত। বিপরীত দিক থেকে একটা গাড়ি নেমে এল। গাড়িটার মাথায় অনেক লাগেজ। ভেতরেও অনুরূপ ভিড়। একটা-দুটো বাড়ি, কাঠের জানলায় কাচ। রঙিন পর্দা। বারান্দায় ঝোলানো টবের গাছে অনেক অনেক পুষ্প ফুটে যেন রাজি হয়ে আছে, মালা হবে তোমার গলায়।

গোম্পুজ। চেনা হোটেল। মোটাসোটা মালকিন দিদিটির সঙ্গে সেবার অনেক গল্প হয়েছিল। স্বর্ণেন্দু ( সরকার, মধু-প্রচারক) আর আমি এসেছিলাম। দিদি এখন হোটেলে নেই, তবে ঘর আছে। ব্যাগ রেখে, দাঁত মেজে নীচের রেস্তোরাঁয়। টোস্ট অমলেট কফি ব্ল্যাক। বেশ বেশ। এবার ঘুরে আসা যাক। দেখা যাক মানুষের, বাজারের রং।

স্থানীয় ব্যাগ কিনলাম একটা। পেস্তা বাদামের ছোটো একটা প্যাকেট। রয়্যাল চ্যালেঞ্জের বড়ো একটা বোতল। কিছুটা ঘুরেফিরে চলে আসি ঘরে। পথে সঙ্গ নেয় একটা কুকুর। বিস্কুট দিই। গ্লাস ধুই। জানলা দিয়ে দু-একটা দোকান আর রাস্তার কিছু কিছু দৃশ্য চোখে পড়ে। কতরকমভাবে যে হেঁটে চলে যায় কত কত মানুষ। কালো সোয়েটার পরা মেয়েটাকে ভালো লাগল খুব। দুপুরে আর খেলাম না কিছু। স্বল্প একটা ঘুম, লেপের আদরে। বিকেল গড়িয়ে শেষে আলোঝলমল সন্ধ্যা। আকাশে ফোটে তারা। ঘরে থাকা দায় হয়ে ওঠে আমার। আবার সেই বাজার, পেরিয়ে নির্জন পথে। অন্ধকারে মেশা পাহাড়ের মাথার ওপরে নক্ষত্রের মেলা। রাত হল। ' হং কং' থেকে মিক্সড চাউমিন কিনে, ঘরে চলো মন। সেখানেই তো ভুবন-ভোলানো একটি শিশুর দেখা পেলে তুমি। খেতে খেতে মনে হল, এভাবে একা একা ভ্রমণের মধ্যে কোথাও যেন একটা সঙ্গীবিহীন শূন্যতা এবং পূর্ণতার বোধ, পাশাপাশি---- সমান্তরালে বয়ে বয়ে চলে, পাহাড়ি পথের খাদে, অবরুদ্ধ তিস্তা নদীটির মতো।

সুরুক-সামথাই যাব। পরদিন সকালে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললাম দিদিকে। আবার আসবেন। পিঠে ছোট্ট ব্যাগ। বৃষ্টি মাথায় হেঁটে। বাস। শিলিগুড়িগামী। পেছনের দিকে বসেছিলাম। নামিয়ে দেবেন ঠিক জায়গায়। তিস্তা বাঁধ প্রকল্পের গেট একুশ মাইল। কনডাক্টরকে বলেছিলাম। পাছে ভুল হয়ে যায়, তাই নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল সামনের সিটে। ও-ও যাবে সুরুক। একটি কিশোরীকে দেখিয়ে বলল। হাসি, বিনিময় হল। নামলাম একইসঙ্গে। নদীর পাড়ে ক্ষুদ্র একটা দোকান। কাঠের দেওয়াল, মাটির মেঝে। মোমো নিলাম, লিকার চা। মেয়েটি কোল্ড ড্রিঙ্কস, চিপস। আপনি কি প্রোগ্রামে যাচ্ছেন? হ্যাঁ। আমিও ওখানেই যাব। নাম পূজা, পদবি ভুজেল। কালিম্পঙে থেকে পড়াশোনা করে। কোন ক্লাস? ইলেভেন। কী মিষ্টি মুখটা, সরলরেখার মতো। তুমি কীভাবে যাবে? বাইক নিয়ে আসবে পাপা। আপনি? বন্ধু আসবে জিপগাড়ি নিয়ে। দোকানের বাইরে ঘোরাঘুরি করি। ছবি তুলি, মন-ক্যামেরায়। নদী গাছ ফুল পাখি। আইয়ে, বলে চলে যায় পূজা। গাড়ি নিয়ে আসে বন্ধু। তিস্তার গতি ধরে ধরে, ধীরে ধীরে, ভাঙাচোরা পথে উঠি উপরের দিকে। ওইখানে সেই গ্রাম, সুরুক-সামথাই। বিকালে দেখি পূজার নাচ, শুনি গান। পরদিন সকালে ফেরার পথে আমার গাড়ির বনেটে উড়ে এসে বসে একটা ময়ূর।

From around the web

Education

Headlines