আজ বিকেল: ভারতের এলপিজি ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের একটি গভীর বিশ্লেষণ। জানুন কেন আপনার রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারের ভাগ্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করছে। জানুন, ভারত এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আমাদের রান্নাঘরের এক কোণে শান্তভাবে পড়ে থাকা গ্যাসটি আপাত নিরীহ মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। পারস্য উপসাগরের কোনও এক রিফাইনারি থেকে বিশাল জাহাজে করে এই গ্যাস ভারতের কোনও না কোনও বন্দরে পৌঁছায়, যা পাড়ি দেয় বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত জলপথ। ভারতের প্রতিটি নাগরিকের জন্য এই যাত্রাপথ বোঝা এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, হাজার মাইল দূরে ঘটা কোনও যুদ্ধ সরাসরি আপনার রান্নাঘরকে প্রভাবিত করতে পারে। জানতে চান, কীভাবে?
ভারতের পরিচ্ছন্ন অর্থনীতির (Cleaner Economy) দিকে ধাবিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস একটি প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জ্বালানিকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
ক) এলপিজি (LPG – Liquefied Petroleum Gas): এটি মূলত প্রোপেন এবং বিউটেন গ্যাসের মিশ্রণ। মাঝারি চাপে এগুলি তরল অবস্থায় থাকে, যার ফলে সিলিন্ডারে ভরে সহজেই বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া যায়। রান্নার কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি এটি শিল্পকারখানা ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
খ) সিএনজি (CNG – Compressed Natural Gas): এটি মূলত মিথেন গ্যাস। একে তরল না করে উচ্চ চাপে সংকুচিত করে ট্যাঙ্কে রাখা হয়। ভারতের শহরগুলিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস (PNG) পৌঁছে দেওয়ার এবং পরিবহণে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে সিএনজির ব্যবহার দ্রুতহারে বাড়ছে।
কৌশলগত গুরুত্ব:
কয়লা বা পেট্রোলিয়ামের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাস অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, যা বায়ুদূষণকারী কণা নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এটি জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, আমাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা কি ভারতের আছে?
দেশীয় উৎপাদন VS ক্রমবর্ধমান চাহিদা:
ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তবে একটি বিশ্লেষকের একাংশের দাবি, ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং চাহিদার মধ্যে একটি কৌশলগত স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি (ONGC) কয়েক দশক ধরে ভারতের কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিন, মুম্বাই হাই, গুজরাট, আসাম এবং রাজস্থানের মতো এলাকায় গ্যাস উত্তোলন করছে। তবুও গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বছরে ৩০ বিলিয়ন কিউবিক মিটারের নিচেই স্থীর হয়ে আছে।
ঘরোয়া চাহিদা মেটাতে ভারত এখন বিপজ্জনকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২০১৫ সালে যেখানে ভারতের এলপিজি আমদানির হার ছিল ৪৭%, ২০২৪ সালে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭%। এই ক্রমবর্ধমান আমদানি নির্ভরতা ভারতকে চরম অস্থিরতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই বিশাল চাহিদার ভারতকে নিরন্তর পশ্চিমের দিকে, বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম অস্থির ভৌগোলিক অঞ্চলের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।
ভারতের গ্যাস আমদানির কৌশলগত মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ভারতের মোট এলপিজি আমদানির ৯৫ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চল যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং কাতার থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর এই অতিনির্ভরতার পেছনে একটি কারিগরি কারণ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলির এলপিজিতে বিউটেনের পরিমাণ বেশি থাকে, যা ভারতীয় গ্রাহকদের ব্যবহারের প্রোফাইলের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। এছাড়াও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পরিবহণ খরচও তুলনামূলক কম।
আর সেই কারণে হরমুজ প্রণালী ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এবং ওমানের মধ্যবর্তী মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের হৃদয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম তরলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
যুদ্ধের কারণে বিমা কোম্পানিগুলি জাহাজে বিমা সুবিধা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে আগামীদিনে পরিস্থিতি ঠিকঠাক না হলে জাহাজ চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা ভারতের জ্বালানি সরবরাহকে সরাসরি পঙ্গু করে দিতে পারে মত বিশেষজ্ঞদের।
একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ থাকা কেবল প্রয়োজনীয় নয়, বরং অপরিহার্য। তবে এলপিজির ক্ষেত্রে ভারতের প্রস্তুতি উদ্বেগজনক। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে ভারতের কাছে প্রায় ৭৪ দিনের মজুদ থাকলেও, এলপিজির ক্ষেত্রে এই বাফার স্টক মাত্র ১০ থেকে ৩০ দিনের। এলপিজি মজুদের জন্য প্রয়োজনীয় ‘স্ট্র্যাটেজিক ক্যাভার্নে’র অভাব ভারতের জন্য একটি বড় দুর্বলতা। সরবরাহ মাত্র ১০ দিনের জন্য বন্ধ হলে দেশে রান্নার গ্যাসের জন্য হাহাকার তৈরি হবে, যা কেবল অর্থনীতি নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর চরম আঘাত হানতে পারে। এই সীমিত মজুদ ভারতকে যেকোনও সংকটে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ফেলে দেয়।
এই উচ্চমাত্রার ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারত তার জ্বালানি কূটনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনছে। শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর নির্ভর না থেকে বৈচিত্র্যকরণই এখন প্রধান লক্ষ্য।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এক বছরের চুক্তিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা ভারতের এলপিজি আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ নিশ্চিত করবে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হওয়া ইরানের অর্থনীতির জন্যও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। তাই এর দীর্ঘমেয়াদী বন্ধের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে বিশ্লেষকদের দাবি, ভারত আর কেবল ‘সম্ভাবনা’র ওপর নির্ভর করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আর কেবল নীতিনির্ধারকদের আলোচনার টেবিলের বিষয় নয়, এটি সরাসরি প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সঙ্গে জড়িত। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সীমিত কৌশলগত মজুদ ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জ্বালানি সরবরাহের এই লজিস্টিকস চেইনকে সুরক্ষিত রাখা এবং দ্রুত কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।