শেয়ার বাজারে বড়সড় ‘কেলেঙ্কারি’! বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে?

আজ বিকেল: বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই শেয়ার বাজারে কেলেঙ্কারি করেছেন? অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই তিনি বিশ্ব তেলের বাজারকে প্রভাবিত করছেন। তবে এর পেছনে কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক লাভ নয়, বরং লুকিয়ে আছে আমেরিকার এক বিশাল অর্থনৈতিক ...

Published On:

আজ বিকেল: বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই শেয়ার বাজারে কেলেঙ্কারি করেছেন? অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই তিনি বিশ্ব তেলের বাজারকে প্রভাবিত করছেন। তবে এর পেছনে কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক লাভ নয়, বরং লুকিয়ে আছে আমেরিকার এক বিশাল অর্থনৈতিক নীল নকশা।


কীভাবে এই কেলেঙ্কারি ঘটালন ট্রাম্প? এর পেছনের রয়েছে ৬টি ধাপ। গত ২৩ মার্চ ট্রাম্প তাঁর নিজের কেনা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথে’ একটি পোস্ট করেন৷ সেখানে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে৷ এই পোস্টের পরই শেয়ার বাজার চাঙ্গা হতে শুরু করে৷ তেলের দাম নাটকীয়ভাবে নিচে নামতে শুরু করে৷ মজার ব্যাপার হল, মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ইরান সরকার স্পষ্ট জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁদের কোনও কথাই হয়নি৷ পুরোটাই মিথ্যকথা বলেছেন ট্রাম্প৷ আর ততক্ষণে যা হওয়ার বাজারে তা হয়ে গিয়েছে৷

আমেরিকায় সময় তখন সকাল ১১:০৪ মিনিট৷ ট্রাম্পের পোস্টের ঠিক আগে, সকাল ১০:৪৮ মিনিটে তেলের বাজারে বিপুল পরিমাণ শর্ট সেলিং হয়েছিল৷ অর্থাৎ, খবরটি প্রকাশ্যে আসার আগেই কোনও ইনসাইডার ট্রেডিং হয়ে যায়৷ আর তার ফলে বিশাল অঙ্কের মুনাফা লুটে নেন শর্ট সেলাররা৷

কেন ট্রাম্প তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন? অনেকেই ভাবতে পারেন ট্রাম্প হয়তো, তাঁর পরিবারের সম্পদ বাড়ানোর জন্য এই কাজ করছেন তিনি৷ কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছে৷ ট্রাম্পের এই বাজার কেরামতির মূল লক্ষ্য হল, একটি সুনির্দিষ্ট ছ’ধাপের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা৷


১. তেলের সরবরাহ: ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (IEA) আশঙ্কা, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডা এবং আর্জেন্টিনা মিলে ওপেক (OPEC) ভুক্ত দেশগুলির চেয়েও বেশি তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে৷ আমেরিকার এই ক্ষমতার মূল উৎস হল, তাদের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ আরও বাড়ানো৷


কী সেই পরিকল্পনা?


২. ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার: অন্যান্য দেশের ওপর মার্কিন প্রযুক্তি চাপিয়ে দিতে বা বাণিজ্য সুবিধা আদায় করতে কাচা তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা৷


৩. তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ: তেলের দাম কমিয়ে রাখার চেষ্টা আমেরিকা নিজের স্বার্থে চালিয়ে যাচ্ছে৷


৪. মার্কিন প্রযুক্তি: তেলের দাম কম থাকলে আমেরিকার জিডিপি বাড়াতে সাহায্য করবে৷ আর সেই সুযোগে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির শেয়ারের দাম বাড়বে৷ কোটি কোটি ডলার ঘরে তুলতে পারবেন ইলন মাস্ক, পিটার থিয়েল, মার্ক অ্যান্ডারসনের মতো ব্যক্তিরা৷


৫. বিশ্বব্যাপী এআই: অন্যান্য দেশকে বাধ্য করা হবে যেন তারা মার্কিন প্রযুক্তি ও ডাটা সেন্টার গ্রহণ করে৷ অন্যথায় তেলের বাজারে দাম ধসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতে পারে৷


৬. মার্কিন ঋণের বোঝা: বর্তমানে প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে আমেরিকার৷ বিপুল এই ঋণের বাৎসরিক সুদ ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার৷ ফলে, বিশ্ব অর্থনীতি এবং টেক শেয়ারে প্রভাব খাটিয়ে এই ঋণের বোঝা কমানোই হল ট্রাম্পের একমাত্র লক্ষ্য৷ আর তা না হলে ঢুবে যাবে গোটা মার্কিন অর্থনীতি৷

কার লাভ, কার ক্ষতি?


এই মাস্টারপ্ল্যানের ফলে বাজারে কিছু জয় ও পরাজয় দুটিই হয়েছে৷ তাতে পরক্ষ ভাবে লাভবান হয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি৷ লাভ হয়েছে কনজিউমার ডিসক্রিশনারি খাত ও ভারতের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলি৷ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০-৭০ ডলারে কমে গেলে ভারতের অর্থনীতির জন্য তা অত্যন্ত ইতিবাচক৷ এছাড়া ভোলাটিলিটি ট্রেডাররাও লাভবান হবেন৷ কারণ, তাঁরা তো ঘোলা জলেই মাছ ধরতে বেশি পছন্দ করেন৷


ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেল সংস্থাগুলি৷ আর সেইসব বিনিয়োগকারী যারা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ ইনডেক্সে বিনিয়োগ করে রাখেছিলেন৷ বাজারে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের কারণে তেলের বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রাহ কমবে৷ বাজারে ঝুঁকি বাড়বে৷

‘বারবেল স্ট্র্যাটেজি’

এমন অস্থির বাজারে আপনার বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখতে পারে৷ কিন্তু কীভাবে?এমন অস্থির বাজারে আপনার বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখতে পারে৷ কিন্তু কীভাবে?

এমন অস্থির বাজারে আপনার বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখতে পারে৷ কিন্তু কীভাবে?এমন অস্থির বাজারে আপনার বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখতে পারে৷ কিন্তু কীভাবে?

১. হঠাৎ বাজার পড়ে গেলে পোর্টফিলিওর ২০-৩০% নগদ অর্থে রাখুন৷ ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের হাত থেকে বাঁচতে ইউএস ডলারে ফিক্সড ডিপোজিট করার কথাও বিবেচনা করতে পারেন৷
২. বিশ্ব অর্থনীতি এখন K-আকৃতির হয়ে গিয়েছে৷ যেসব দেশের জিডিপি বৃদ্ধি বেশি, যেমন আমেরিকা, ভারত ও ল্যাটিন আমেরিকার কিছু দেশ৷ সেখানে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। যেসব দেশের জিডিপি বৃদ্ধি হার দুর্বল, সেখানে বিনিয়োগ এড়িয়ে চলুন৷
৩. মার্কিন টেক শেয়ারে অন্তত তিন বছরের লক্ষ্য নিয়ে পোর্টফোলিওর একটি বড় অংশ বিনিয়োগ করতে পারেন৷ কারণ, বর্তমানে মার্কিন নীতিগুলির মূল লক্ষ্যই হল, টেক সেক্টরকে বড় করা৷
৪. ‘ইনফ্লেশন প্রোটেকশন বন্ড’ও বিকল্প হতে পারে৷ কারণ, প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো মাঝারি মানের রিটার্ন দেওয়া মাধ্যমগুলি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে বর্তমানে পাল্লা দিতে পারছে না৷

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিছক কোনও রাজনৈতিক চমক নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ছকমাত্র৷ একজন সচেতন বিনিয়োগকারী হিসেবে বাজারের এই খেলা বুঝে স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করাই হবে এখনকার সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তার কাজ৷

Leave a Comment