Blue Monday

নয়াদিল্লি: ‘সানডে ব্লুজ’ কথাটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত৷ মানে আর কয়েকঘন্টা পরেই ফুরিয়ে যাবে একটা ছুটির দিন৷ আবার শুরু হবে কর্মব্যস্ত একটা সপ্তাহ৷ এটা একধরনের ‘ফোবিয়া’ বলা যায়৷ তেমনই মানডে অর্থাৎ সোমবার হল সেই দিন, যা সারা বছর ৫২ বার বিরক্তিকরভাবে কর্মব্যাস্ততার সূচনা করে৷ এই ফোবিয়াকে ‘মানডে ব্লুজ’ বলা হয়৷ যদিও এর সবটাই মানসিক এবং ব্যক্তি বিশেষে অত্যন্ত প্রভাবশালী৷

একথা সত্যি যে অন্যান্য দিনের তুলনায় সোমবার দিনটাতেই সব বয়সের মানুষের মনে একটা অহেতুক ‘ভালো না লাগা’ কাজ করে৷ সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বেশীরভাগ মানুষের কাছেই সপ্তাহের এই প্রথম দিনটা বড় বেমানান লাগে৷ স্কুল-কলেজের পড়ুয়া থেকে অফিস কর্মী, এমনকি গৃহীনিরাও এই তালিকায় পড়েন৷

‘সোমবার’ ইংরেজিতে ‘মানডে’ নামটি প্রাচীন ইংরেজী শব্দ ‘মানানডেগ’ এবং মধ্য ইংরেজি ‘মোনেডে’ থেকে এসেছে৷ এটি মূলত ল্যাটিন ভাষার একটি অনুবাদ ‘ডাইজ লুনাই’ যার অর্থ ‘চাঁদের দিন’৷ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবারের তুলনায় রবিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বড়সড় মানসিক পরিবর্তন ঘটে৷ মার্কিন মুলুকে তো, ‘মানডে’ শব্দটিকে বড়সড় এবং ভারী স্লেজহ্যামার সঙ্গে তুলনা করে বর্ণনা করতে করা হয়৷

তবে আশ্চর্যজনকভাবে সোমবারের যে ভয়ঙ্কর তত্ত্বটি গবেষণায় উঠে এসেছে তার ভিত্তিতে, সোমবার দিনটিকে ‘হার্ট অ্যাটাকের দিন’ বলছেন গবেষকরা৷ অর্থাৎ সপ্তাহের এই শুরুর দিনটিতে দিনে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি পায়৷

তবে সোমবারের আরও খারাপের দিকটি হলো সপ্তাহের এইদিনটিতেই নাকি বেশিরভাগ মানুষ নিজেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য বেছে নেয়৷ সেই অর্থে একে ‘আত্মহত্যার দিন’ হিসাবেও বিবেচনা করা হচ্ছে৷ বিজ্ঞানীরা মানুষের প্রতিদিনের আবেগ তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন যে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততা থেকে মানুষের মনে কাজের প্রতি অনীহাই সোমবার দিনটিকে বেশী যন্ত্রণাদায়ক করে তুলছে৷

সেক্ষেত্রে গতিশীল সমাজে কর্মক্ষেত্রে অসম্ভব চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এই সোমবার দিনটিকেই সবচেয়ে ঘুম বর্জিত দিন বলা যায়৷ বিজ্ঞানীদের মতে, সপ্তাহান্তে সমস্ত কাজের চাপ দূরে সরিয়ে রেখে আমরা যে অতিরিক্ত ঘুমের সময় পাই তার সম্পূর্ণ বীপরীত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় সোমবার৷ সেই ভাবনাও আমাদের অবচেতন মনে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে৷

ঘড়ির কাঁটা মেপে যখন সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়, তখন তা সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর তুলনায় বেশী বিরক্তিকর হয়৷ ২০১১ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে মাসের অন্য দিনগুলিতে গড়ে ২২ মিনিটের তুলনায় সোমবার একজন ব্যক্তি ৩৪ মিনিট মনোকষ্টে ভোগেন৷ অত্যন্ত স্বাস্থ্যসচেতন মানুষও সপ্তাহের এই প্রথম দিনটিতে বেশি ওজন বৃদ্ধি করে৷ গবেষণায় আরও দেখা যাচ্ছে, যে পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ এই কর্মব্যস্ত সোমবারে সব থেকে কম কাজ করে৷ এইদিন মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা কাজ করে একজন মানুষ৷

চল্লিশোর্ধ কর্মীরাই এইদিন সবথেকে বেশী মানসিক চাপ অনুভব করেন৷ ফলে দিনটি ৩০ শতাংশ কম উৎপাদনশীল হয়৷ আসলে গতিশীল সমাজে সুস্থ সামাজিকীকরণের অভাব আমাদের আরও বেশী অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে৷ ছুটির দিনে খোলা মনে সামাজিক, গঠনমূলক কাজকর্ম বা আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে মেলামেশার ফলে মনোভাবের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে৷ তবে বর্তমানে কর্মব্যস্ত নিউক্লিয়ার সোসাইটিতে এসবের অভাবে উইকএন্ডগুলো বড় বেশী একঘেয়ে হয়ে ওঠে৷ এরই ফলশ্রুতি সোমবার সপ্তাহ শুরুর দিনটা চাপের মনে হয়৷

তবে এই পুরো সমস্যাটাই যখন মানসিক৷ তখন সোমবারের ভীতি কাটিয়ে উঠতে আমরা নিজেরাই পারি৷ যেমন এইদিন অর্থাৎ সপ্তাহ শুরুর দিন থেকেই যদি উইক এন্ড-এর প্ল্যানিং শুরু করে দেওয়া যায় তাহলে কখন যে কাজের দিনগুলো কেটে যাবে বোঝাই যাবেনা৷ পাশাপাশি কাজের জায়গায়তেও সকল সকাল কাজ শুরু করার আগে সহকর্মীরা মিলে খোসমেজাজে একটু গল্পগুজব করে নেওয়া যায় তাতেও কাজের ক্ষেত্রে নতুন উদ্দম ফিরে আসে৷ তবে শরীর চর্চা যেহেতু মা মানসিক অবসাদ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে তখন প্রতিদিন নিয়ম করে শরীর চর্চা করলে এই বিরক্তি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলেই মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা৷

সুতরাং এখন থেকে সমস্ত মানসিক অবসাদ ঝেড়ে ফেলে ‘উইকএন্ডের’ ভরপুর আনন্দের অক্সিজেনে মনপ্রাণ ভরে নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে শুরু করুন সপ্তাহের প্রথম দিন৷ আর মনের ‘ডেইলি ডায়েট’ হিসেবে হাজার কর্মব্যস্ততার মধ্যেই একটু একটু করে শুরু করে দিন আগামী ‘উইকএন্ডে-র’ প্ল্যানিং৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here